বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাতে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে চীন-মার্কিন বাণিজ্য বিবাদ। পরিস্থিতিকে আরো সঙ্গিন করে তুলেছে আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি। নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। তবে এর বিপরীতে এখন পর্যন্ত ‘অনেকটা অবিশ্বাস্য ধরনের স্থিতিস্থাপকতা’ দেখাতে সক্ষম হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) শুল্ক ও অন্যান্য নীতিগত ধাক্কা সত্ত্বেও কোথাও এখন পর্যন্ত অর্থনীতিতে তেমন কোনো বড় মাত্রায় বিপর্যয় দেখা যায়নি। আবার এ নিয়ে আশঙ্কাও কাটেনি। বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি অদূর ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নিতে পারে সে বিষয়ে এখন স্পষ্ট কোনো ধারণা দিতে পারছেন না অর্থনীতিবিদরা।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের নেতা ও বিভিন্ন দেশের স্থানীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারক সংস্থাগুলোর প্রধানরা বলছেন, ‘অনিশ্চয়তাই’ এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন স্বাভাবিক প্রবণতা (নিউ নরমাল)। এ অবস্থায় ভবিষ্যৎ নিয়ে সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারার মতো কোনো সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো যাচ্ছে না বলে অভিমত তাদের।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউজে প্রবেশের সম্ভাবনা দেখা দিলে বিশ্বব্যাপী পুরনো অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল অর্থনীতিবিদদের মধ্যে। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নে চীনের সঙ্গে শুল্কবিবাদে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আভাস পাচ্ছিলেন তারা। এরপর গত জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর তার বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত এ আশঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে তোলে। গত এপ্রিলে ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের দ্বিবার্ষিক বৈঠকের প্রথম পর্যায়ে একত্র হয়েছিলেন বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা। সে সময় ট্রাম্পের সদ্য ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক নিয়ে সবার মধ্যে উদ্বেগ ছিল স্পষ্ট।
ওয়াশিংটনে এ বৈঠকের পরবর্তী ও শেষ পর্যায় অনুষ্ঠিত হয় গত ১৮ অক্টোবর। এবারের বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যে দেখা গেছে অনিশ্চয়তা ও সতর্কতা। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ, ট্রাম্পের শুল্কনীতি বা অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হঠাৎ পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। এ পরিবর্তনই এখন ঘটছে সবচেয়ে বেশি মাত্রায়। এমন পরিস্থিতিতে নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলোকে পরখ করে দেখার প্রয়োজনীয়তাও তৈরি হয়েছে।
থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পিটি দিসিয়াতাতের ভাষ্যে, ‘লিবারেশন ডে শুল্ক ঘোষণার পর থেকে নীতিনির্ধারক হিসেবে পুরো পরিস্থিতি বোঝা, নীতিপ্রণয়ন ও জনগণের কাছে তা সহজভাবে উপস্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অনিশ্চয়তা অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি।’
ওয়াশিংটনের বৈঠকে অংশ নেয়া জাপানের প্রতিনিধি বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনীতি কয়েক মাস আগের তুলনায় এখন বেশি স্থিতিশীল মনে হচ্ছে। কিন্তু নানা অনিশ্চয়তা যেভাবে জেঁকে বসেছে, তাতে স্বস্তি নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
পরস্পরের ওপর আরোপিত বর্ধিত শুল্ক স্থগিতের পর সম্প্রতি নতুন করে বিবাদে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। পরিস্থিতির রাতারাতি অবনতি বিবেচনায় অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের মধ্যে বিরোধ যেকোনো সময় নতুন রূপ নেয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব দেখা গেছে, বৈঠকে উপস্থিত শতাধিক নীতিনির্ধারকের আলোচনায়। চীন-মার্কিন সম্পর্কের বাইরে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থার দিকে নজর রাখছেন তারা। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানান, সংস্থার আগের কোনো অর্ধবার্ষিক বৈঠকে এত বেশি গঠনমূলক আলোচনার সাক্ষী হননি তিনি।
এক ব্যাংকিং সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি এত অনিশ্চিত যে এখন কেউ কোনো ধরনের ভনিতা করার সুযোগ পাচ্ছেন না। অর্থনৈতিক উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আগে স্বাভাবিক মনে করা হতো। কিন্তু এখন অনেক দেশ বুঝতে পেরেছে সে পরিস্থিতিকে এখন আর স্বাভাবিক হিসেবে নেয়া যাবে না।’
বৈঠকে ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রধান নগোজি ওকনজো-ইওয়েলা জানান, যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনা যতই তীব্র হোক না কেন, এখন তা বৃহত্তর বাণিজ্যযুদ্ধে রূপ নেয়নি। বরং অনেক দেশ এখন এ দুই দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী।
এক সাক্ষাৎকারে নিউজিল্যান্ডের অর্থমন্ত্রী নিকোলা উইলিস বলেছেন, ‘ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়ে চলায় সামনের দিনগুলোয় বিশ্বব্যাপী দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদারের প্রবণতা বাড়বে।’
তিনি উল্লেখ করেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এখন ১১ সদস্যের ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (সিপিটিপিপি) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। নিকোলা উইলিস বলেন, ‘সব বাণিজ্য সম্পর্কই এখন খুব শক্তিশালী। আমাদের অংশীদারদের বার্তা হচ্ছে, তারা সম্পর্ক দুর্বল না করে আরো মজবুত ও সম্প্রসারণ করতে চায়।’
বৈঠকে মিসরের পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী রানিয়া আল-মাশাত বলেন, ‘বৈশ্বিক ঘটনাবলির ফল হলো বর্ধিত আঞ্চলিক সহযোগিতা। ভবিষ্যতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।’
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে থাকা বিভিন্ন ধরনের চাপও অর্থনীতিবিদদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এর অন্যতম আন্তর্জাতিক লেনদেনে ভারসাম্যহীনতা, প্রায়-রেকর্ড ঋণস্তর, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের ঝুঁকি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসৃষ্ট (এআই) নানা ধরনের ব্যাঘাত।
এ পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারণে সতর্কতা বজায় রাখা উচিত বলে মনে করছেন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি। তার মতে, ‘সাবপ্রাইম মর্টগেজ ২০০৭-২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু তখন তা শনাক্ত করা যায়নি। সে বিষয় মনে রেখে এখন থেকেই সতর্কতা বজায় রাখা অপরিহার্য।’
তিনি বলেন, ‘স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত এমন একটি জগতে যেখানে ব্যাংকিং, বীমা ও প্রাইভেট ফাইন্যান্সের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংযোগ রয়েছে। আমাদের কর্তব্য হচ্ছে পরিস্থিতি খোলাসা করা এবং কী ঘটছে তা পর্যবেক্ষণে রাখা।’
বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে শেয়ার মূল্যের সাম্প্রতিক উল্লম্ফন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। আইএমএফ সতর্ক করে বলছে, বাজারে আত্মতুষ্টি এখন অনেক বেশি। এটি বাণিজ্য যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৃহৎ সরকারি ঘাটতির কারণে ‘অসংগঠিতভাবে’ বাজার সংশোধনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। —রয়টার্স অবলম্বনে